close

ইসলাম

ইসলাম

মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা

Untitled-3 copy

সৃষ্টি যা কিছু দৃশ্যমান, স্রষ্টা ধ্বংসশীলতাকে করেছেন তার বৈশিষ্ট্য। তেমনি ধ্বংসশীল এ পৃথিবীতে মৃত্যুকে করেছেন প্রতিটি প্রাণের চূড়ান্ত পরিণতি। এর মাধ্যমে রুহকে তিনি বিদায় নিইয়ে দেন দেহ থেকে, পৃথিবীর সকল বস্তুসম্ভার থেকে অনন্ত জগতের পথে…।

বান্দার আমল ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে দিয়েছেন শেষ পরিণতিরও ভালো/খারাপ দুটি অবস্থা। ভালো পরিণতি বা ভালো মৃত্যু বলতে যা বুঝায় তা হলো, বান্দা মৃত্যুর সময় নিজেও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকে, আর আল্লাহও থাকেন তার উপর সন্তুষ্ট। এভাবে যে- তার মৃত্যু হয় এমন অবস্থায় যখন সে আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা থেকে দূরে আছে, সকল পাপাচার থেকে তাওবাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তার আনুগত্যে পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছে ও নেককাজে অগ্রণী হয়েছে। আর এ ভাল অবস্থাতেই তার ইন্তেকাল হয়েছে। এমন হলেই বলা হবে তার শেষ পরিণতি ভাল হয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে-
عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا أراد الله بعبده خيرا استعمله قالوا : كيف يستعمله؟ قال: يوفقه لعمل صالح قبل موته رواه أحمد

 

 

‘হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— যখন আল্লাহ কোনো মানুষের কল্যাণ করতে চান তখন তাকে সুযোগ করে দেন। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কিভাবে সুযোগ করে দেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন— মৃত্যুর পূর্বে তাকে সৎকাজ করার সামর্থ দান করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)

শেষ পরিণতি ভাল হওয়ার কিছু আলামত রয়েছে। কিছু আলামত এমন যা মৃত্যুকালে মুমিন ব্যক্তি নিজে অনুভব করতে পারেন, মানুষের কাছে প্রকাশ পায় না, আর কিছু আছে যা মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়।

যে আলামতগুলো বান্দা নিজে মৃত্যুকালে উপলদ্ধি করেন তা হলো— মুত্যুকালে আল্লাহর সন্তুষ্টির সংবাদ, তাঁর অনুগ্রহ, যার সুসংবাদ ফেরেশতারা নিয়ে আসে। যেমন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ . نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآَخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ . نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ
‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে, তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে এবং আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে, যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমরা আদেশ কর। এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন।’ (সুরা হা-মীম সিজদাহ: ৩০-৩২)

ফেরেশতারা এ সুসংবাদ যেমন মৃত্যুকালে দেয় তেমনি কবরে অবস্থানকালে দেয় এবং কবর থেকে পুনরু

 

 

 

 

ত্থানের সময়ও দেবে। হাদিসে এর বর্ণনা এসেছে-
عن عائشة رضي الله عنها قالت : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : (من أحب لقاء الله أحب الله لقائه، ومن كره لقاء الله كره الله لقائه) فقلت يا نبي الله : أكراهية الموت ؟ فكلنا نكره الموت! فقال : (ليس كذلك، ولكن المؤمن إذا بشر برحمة الله ورضوانه وجنته أحب لقاء الله فأحب الله لقائه، وإن الكافر إذا بشر بعذاب الله وسخطه كره لقاء الله فكره الله لقائه . رواه مسلم
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন— যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসে আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে ভালবাসেন। আর যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আল্লাহ তার সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে নবী! সাক্ষাৎকে অপছন্দ করার অর্থ কি মৃত্যুকে অপছন্দ করা? আমরাতো সকলেই মৃত্যুকে অপছন্দ করে থাকি! তিনি বললেন, ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। বিষয়টা হলো, মুমিন ব্যক্তিকে যখন আল্লাহর রহমত, তার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসতে থাকে। ফলে আল্লাহ তাআলা তার সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসেন। আর যখন আল্লাহর অবাধ্য মানুষকে আল্লাহর শাস্তি ও তার ক্রোধের খবর দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে। ফলে আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।’ (মুসলিম)

 

 

 

 

এ হাদিসে মৃত্যুকে পছন্দ আর অপছন্দ করার যে কথা বলা হয়েছে তা হলো মৃত্যু যখন উপস্থিত হয়ে যায় ও তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায় তখনকার সময়। মৃত্যু উপস্থিত হলে মুমিন ব্যক্তি সুসংবাদ পেয়ে মৃত্যুকে ভালবাসে আর আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি তখন মৃত্যুকে ঘৃণা করে।

আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসার প্রমাণ হলো পরকালকে সর্বদা পার্থিব জীবনের উপর প্রাধান্য দেবে। দুনিয়াতে চিরদিন অবস্থান করার আশা করবে না বরং পরকালীন জীবনের জন্য সৎকর্মের মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকবে।

আর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করার বিষয়টি হলো ঠিক এর বিপরীত। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার জীবনকে পরকালের উপর প্রাধান্য দেয় এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে না। এদের তিরস্কার করে আল্লাহ বলেন- إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا
‘নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট এবং এতে পরিতৃপ্ত থাকে।’ (সুরা ইউনুস-৭)

ভালো মৃত্যুর কিছু উপায়
এক. আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়া অবলম্বন করা:
আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়ার মূল হলো সর্ব ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ তথা একাত্ববাদ প্রতিষ্ঠা। এটা হলো; সকল প্রকার ফরজ ওয়াজিব আদায়, সব ধরনের পাপাচার থেকে সাবধান থাকা, অবিলম্বে তাওবা করা ও সকল প্রকার ছোট-বড় শিরক থেকে মুক্ত থাকা।

দুই. বাহ্যিক ও আধ্যাতিক অবস্থা উন্নত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা:

 

 

 

প্রথমে নিজেকে সংশোধন করার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। যে নিজেকে সংশোধন করার জন্য চেষ্টা করবে আল্লাহ তার নীতি অনুযায়ী তাকে সংশোধনের সামর্থ দান করবেন। এজন্য প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করা অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করা। এটাই মুক্তির পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।’ (সুরা নিসা- ১০২)

আল্লাহ আরও বলেন- وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
‘তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের এবাদত কর।’ (সুরা হিজর-৯৯)

ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য হলো সর্বদা পাপ থেকে সাবধান থাকবে। কবিরা গুণাহকে বলা হয় মুবিকাত বা ধ্বংসকারী। আর অব্যাহত ছগিরা গুণাহ কবিরা গুণাহতে পরিণত হয়ে থাকে। বারবার ছগিরা করলে অন্তরে জং ধরে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إياكم ومحقرات الذنوب، فإنما مثل محقرات الذنوب كقوم نزلوا بطن واد، فجاء ذا بعود، وجاء ذا بعود، حتى أنضجوا خبزتهم، وإن محقرات الذنوب متى يؤخذ بها صاحبها تهلكه. رواه أحمد
‘তোমরা ছোট ছোট গুণাহ থেকে সাবধান থাকবে। ছোট গুণাহে লিপ্ত হয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত হলো সেই পর্যটক দলের মতো যারা একটি উপত্যকায় অবস্থান করল। অতঃপর একজন একজন করে তাদের জ্বালানি কাঠগুলো অল্প অল্প করে জালিয়ে তাপ নিতে থাকল, পরিণতিতে তাদের রুটি তৈরি করার জন্য কিছুই অবশিষ্ট রইল না।’ (মুসনাদে আহমাদ)

কখনো কোনো ধরনের গুণাহকে ছোট ভাবা ঠিক নয়। প্রখ্যাত সাহাবী আনাস (রা.) বলেন-
إنكم لتعملون أعمالا هي أدق في أعينكم من الشعر، إن كنا لنعدها على عهد النبي صلى الله عليه وسلم من الموبقات. رواه البخاري
‘তোমরা অনেক কাজকে নিজেদের চোখে চুলের চেয়েও ছোট দেখ অথচ তা আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ধ্বংসাত্মক কাজ মনে করতাম।’(বুখারি)

তিন. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সর্বদা কান্নাকাটি করা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সর্বদা কান্নাকাটি করে তার কাছে ঈমান ও তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফিক প্রার্থনা করা। তিনি যেন তার সন্তুষ্টির সাথে মৃত্যুর তাওফিক দেন।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই এ দু’আ করতেন- يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك. رواه الترمذي ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অটল রাখেন।’ (তিরমিযি)

ইউসূফ (আ.) দু’আ করতেন- تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
‘তুমি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও এবং সৎ কর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত কর।’ (সুরা ইউসুফ)

চার. আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা:
যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকে ও সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণের সাথে সম্পন্ন হবে তার শেষ পরিণতি শুভ হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة. أخرجه الحاكم
‘যার শেষ কথা হবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম)

অনন্ত দয়ার আধার মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের যেন খাতিমাহ বিল খাইর তথা কল্যাণময় মৃত্যুর সৌভাগ্য লাভের তাওফিক দান করেন, আর আমাদের মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা। আমিন।

 

read more
ইসলাম

হতাশায় ভুগছেন? নবীজির মুখে শুনুন ফিরে আসার গল্প

Untitled-3 copy

বুখারি ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু সাঈদ ইবনে মালেক ইবনে সিনান আল-খুদরী রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, নবী কারীম সা. পূর্ব যুগের এক তাওবাকারির ঘটনা বর্ণনা করে বলেন-
كَانَ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُم رَجُلٌ قَتَلَ تِسْعَةً وَ تِسْعِيْنَ نَفْساً، فَسَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الأَرْضِ، فَدُلَّ عَلَى رَاهِبٍ. فَأتَاهُ فَقَالَ : إنَّهُ قَتَلَ تِسْعَةً وَ تِسْعِيْنَ نَفْساً فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٌ؟ فَقَالَ : لا. فَقَتَلَهُ فَكَمَّلَ بِهِ مِئَةَ، ثُمَّ سَألَ عَنْ أعْلَمِ أهْلِ الأرْضِ، فَدُلَّ عَلى رَجُلٍ عَالِمٍ فَقَالَ: إنَّهُ قَتَلَ مِئَةَ نَفْسٍ فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ ؟ فَقَالَ : نَعَمْ، وَمَنْ يَحُوْلُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ التَّوْبَةِ ؟ اِنْطَلِقْ إلَى أرْضِ كَذَا وَكَذَا فإنَّ بِهَا أُنَاسًا يَعْبُدُوْنَ الله َ تَعَالَى فَاعْبُدِ الله َ مَعَهُمْ، وَلَا تَرْجِعْ إلَى أَرْضِكَ فَإنَّهَا أرْضُ سُوْءٍ. فَانْطَلَقَ حَتَّى إذَا نَصَفَ الطَّرِيْقَ أَتَاهُ المَوْتُ فَاخْتَصَمَتْ فِيْهِ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ وَمَلَائِكَةُ العَذَابِ. فَقَالَتْ مَلاَئِكَةُ الرَّحْمَةِ : جَاءَ تَائِباً مُقْبِلاً بِقَلْبِهِ إِلَى الله ِ تَعَالى! وَقَالَتْ مَلاَئِكَةُ العَذَابِ : إِنَّهُ لَمْ يَعْمَلْ خَيْراً قَطُّ. فَاتَاهُمْ مَلَكٌ فِي صُوْرَةِ آدَمِيٍّ فَجَعَلُوهُ بَيْنَهُمْ -أيْ حَكَماً- فَقَالَ قِيْسُوا مَا بَيْنَ الأرْضَيْنِ، فَإلَى أَيَّتِهِمَا كَانَ أَدْنَى فَهُوَ لَهُ، فَقَاسُوا فَوَجَدُوه أَدْنَى إلَى الأرْضِ الَّتِي أَرَادَ، فَقَبَضْتُهُ مَلاَئِكَةُ الرَّحْمَةِ. متفق عليه.
وفي رواية في الصحيح : فَكَانَ إلَى القَرْيَةِ الصَّالِحَةِ أقْرَبَ بِشِبْرٍ فَجُعِلَ مِنْ أَهْلِهَا.
وفي رواية في الصحيح : فَاَوْحَى الله ُ تَعَالى إِلَى هَذِهِ أنْ تَبَاعَدِي وَإلىَ هَذِهِ أَنْ تَقَرَّبِي. وَقَالَ قِيْسُوا ماَ بَيْنَهُمَا، فَوَجَدُوهُ إلَى هَذِه أَقْرَبَ بِشِبْرٍ فَغُفِرَ لَهُ.

 

 

 

“তোমাদের পূর্বের এক যুগে এক ব্যক্তি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করল। এরপর সে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আলেমের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে এক পাদ্রীকে দেখিয়ে দেয়া হল। সে তার কাছে গিয়ে বলল, সে নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করেছে, তার জন্য তাওবার কোন সুযোগ আছে কি না? পাদ্রী উত্তর দিল, নেই। এতে লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে পাদ্রীকে হত্যা করে একশত সংখ্যা পুরণ করল। এরপর আবার সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেম সম্পর্কে জানতে চাইল। তাকে এক আলেমেকে দেখিয়ে দেয়া হল। সে আলেমের কাছে যেয়ে জিজ্ঞাসা করল, সে একশত মানুষকে খুন করেছে, তার তাওবা করার কোন সুযোগ আছে কি? আলেম বললেন, হ্যাঁ, তাওবার সুযোগ আছে। এ ব্যক্তি আর তাওবার মধ্যে কি বাধা থাকতে পারে? তুমি অমুক স্থানে চলে যাও। সেখানে কিছু মানুষ আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগী করছে। তুমি তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করতে থাকো। আর তোমার দেশে ফিরে যেও না। সেটা খারাপ স্থান। লোকটি নির্দেশিত স্থানের দিকে পথ চলতে শুরু করল। যখন অর্ধেক পথ অতিক্রম করল তখন তার মৃত্যুর সময় এসে গেল। তার মৃত্যু নিয়ে রহমতের ফেরেশ্‌তা ও শাস্তির ফেরেশ্‌তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হল। রহমতের ফেরেশ্‌তাগন বললেন, এ লোকটি আন্তরিকভাবে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। আর শাস্তির ফেরেশ্‌তাগন বললেন, লোকটি কখনো কোন ভাল কাজ করেনি। তখন এক ফেরেশ্‌তা মানুষের আকৃতিতে তাদের কাছে এল। উভয় দল তাকে ফয়সালাকারী হিসাবে মেনে নিল। সে বলল, তোমরা উভয় দিকে স্থানের দূরত্ব মেপে দেখ। যে দুরত্বটি কম হবে তাকে সে দিকের লোক বলে ধরা হবে। দূরত্ব পরিমাপের পর যে দিকের উদ্দেশ্যে সে এসেছিল তাকে সে দিকটির নিকটবর্তী পাওয়া গেল। এ কারণে রহমতের ফেরেশ্‌তাগণই তার জান কবজ করল।” (বুখারী ও মুসলিম)

 

 

 

বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সে ভাল মানুষদের স্থানের দিকে মাত্র অর্ধহাত বেশী পথ অতিক্রম করেছিল, তাই তাকে তাদের অন্তর্ভূক্ত বলে ধরা হয়েছে। বুখারীর আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ যমীনকে নির্দেশ দিলেন, যেন ভাল দিকের অংশটা নিকটতর করে দেয়। আর খারাপ দিকের অংশটার দুরত্ব বাড়িয়ে দেয়। পরে সে বলল, এখন তোমরা উভয় দুরত্ব পরিমাপ করো। দেখা গেল সে মাত্র অর্ধ হাত পথ বেশী অতিক্রম করেছে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট মাসায়েল :

১. ওয়াজ, বক্তৃতা ও শিক্ষা প্রদানে বাস-ব উদাহরণ পেশ করার অনুপম দৃষ্টান- রেখেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

২. যার ইবাদত কম কিন্তু ইলম বেশী, সে শ্রেষ্ঠ ঐ ব্যক্তির চেয়ে, যার ইবাদত বেশী ইলম কম। যেমন এ হাদীসে দেখা গেল যে ব্যক্তি ফতোয়া দিল যে তোমার তাওবা নেই সে আলেম ছিল না, ছিল একজন ভাল আবেদ। তার কথা সঠিক ছিল না। আর যে তাওবার সুযোগ আছে বলে জানাল, সে ছিল একজন ভাল আলেম। তার কথাই সঠিক প্রমাণিত হল।

৩. বিভিন্ন ওয়াজ, নসীহত, বক্তৃতা, লেখনীতে পূর্ববর্তী জাতিদের ঘটনা তুলে ধরা যেতে পারে। তবে তা যেন কুরআন-সুন্নাহ বা ইসলামী কোন আকীদার পরিপন্থী না হয়।

৪. গুনাহ বা পাপ যত মারাত্নকই হোকনা কেন, তা থেকে তাওবা করা সম্ভব।

 

 

 

 

৫. দাঈ অর্থাত ইসলামের দাওয়াত-কর্মীদের এমন কথা বার্তা বলা দরকার যাতে মানুষ আশান্বিত হয়। মানুষ নিরাশ হয়ে যায়, এমন ধরনের কথা বলা ঠিক নয়।

৬.  সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা আলেম ও দায়ীদের একটি বড় গুণ।

৭. অসৎ ব্যক্তি ও অসুস্থ সমাজের সঙ্গ বর্জন করা। এবং সৎ ব্যক্তি ও সৎ সমাজের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করা কর্তব্য।

৮. ফেরেশতাগন বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন।

৯. যে আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করে আল্লাহর রহমত তার দিকে এগিয়ে আসে। তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন এবং পথ চলা সহজ করে দেন।

১০. আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ক্ষমা করে দেয়ার দিকটা  প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

১১. আল্লাহ তাআলা পরাক্রমশালী হওয়া সত্বেও আদল ও ইনসাফ পছন্দ করেন। তাই দু দল ফেরেশতার বিতর্ক একটি ন্যায়ানুগ পন্থায় ফয়সালা করার জন্য অন্য ফেরেশতা পাঠালেন।

১২. হাদীসটি দিয়ে বুঝে আসে, যে মানুষ হত্যা করার অপরাধে অপরাধী আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন যদি সে তাওবা করে। অথচ অন্য অনেক সহীহ হাদীস স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, আল্লাহ মানুষের অধিকার হরণকারীকে ক্ষমা করেন না। অতএব যে কাউকে হত্যা করল সে তো অন্য মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করে নিল। আল্লাহ তাকে কিভাবে ক্ষমা করবেন?

এর উত্তর হল : যে ব্যক্তি কোন মানুষকে হত্যা করল সে তিন জনের অধিকার ক্ষুন্ন করল। ১. আল্লাহর অধিকার বা হক। কারণ আল্লাহ মানুষ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। মানুষকে নিরাপত্তা দিতে আদেশ করেছেন। হত্যাকারী আল্লাহর নির্দেশ লংঘন করে সে তাঁর অধিকার ক্ষুন্ন করেছে। ২. নিহত ব্যক্তির অধিকার। তাকে হত্যা করে হত্যাকারী তার বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করেছে। ৩. নিহত ব্যক্তির আত্নীয়-স্বজন, পরিবার ও সন্তানদের অধিকার। হত্যাকারী ব্যক্তিকে হত্যা করে তার পরিবারের লোকজন থেকে ভরণ-পোষণ, ভালোবাসা-মুহব্বাত, আদর-স্নেহ পাবার অধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত করেছে।

হত্যাকারী এ তিন ধরণের অধিকার হরণের অপরাধ করেছে। আল্লাহর কাছে তাওবা করলে আল্লাহ শুধু প্রথম অধিকার -যা তাঁর নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট- নষ্ট করার অপরাধ ক্ষমা করবেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অপরাধ ক্ষমা করবেন না। এ হাদীসে প্রথম ধরনের অপরাধ ক্ষমা করার কথা বলা হয়েছে। (শরহু রিয়াদিস সালেহীন মিন কালামি সায়্যিদিল মুরসালীন)

 

read more
ইসলাম

সফল হবার চার কুরআনী পরামর্শ

Untitled-3 copy

জীবনে আমরা সবাই কিছু না কিছু পাওয়ার পেছনে বা কোনো কিছু অর্জনে সফল হবার পেছনে ছুটি। সেই কিছুকে পাওয়ার জন্য জীবনে চারটি মাত্র বিষয়ে মনোযোগী হতে হয়। এই চারটি বিষয় আয়ত্ত করতে পারলে যেকোনো মানুষই সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে – ইহকালে এবং পরকালেও। সূরা ‘আসরের দ্বিতীয় আর তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই চারটি বিষয় আমাদের বলে দিয়েছেন। আসুন জনে নিই সেই চারটি বিষয়:

১. বিশ্বাস রাখুন:  “ঈমান” শব্দের অর্থ হলো বিশ্বাস। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে সফলতা চাইলে এক আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল (সা.) এবং রাসূল (সা.) এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে। আর এই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে হলে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে – “আমি পারবই ইনশা’ আল্লাহ”। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

وَالْعَصْرِ. إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ. إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا

 

 

 

উচ্চারণ: ওয়াল ‘আসর ইন্নাল ইনসা-না লাফিই খুসর। ইল্লাল্লাযিনা আ-মানু… (সূরা ‘আসর ১-২)

অর্থ: সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে…

২.  যা করা দরকার তা করে যান: অনেক সময় আমাদের এমন হয় যে – নামায পড়তে ইচ্ছা করে না, যিকর করতে মন চায় না, কোরআন মজিদ পড়ারও আগ্রহ পাওয়া যায় না – তবু যেহেতু আল্লাহ তাআলা  ও তাঁর রাসূল (সা.)  এই আমলগুলো আমাদের করতে বলেছেন – তাই এগুলো করে যেতে হবে। একইভাবে, দুনিয়াতে সাফল্য লাভের জন্যও কিছু রুটিন ওয়ার্ক আছে, সেগুলি আমাদের করে যেতে হবে। যেদিন ভালো লাগবে সেদিনও একজন ছাত্রকে পড়তে বসতে হবে, যেদিন ভালো লাগবে না সেদিনও তাকে পড়তে বসতে হবে; একজন চাকুরিজীবির যেদিন কাজে মন বসবে সেদিন অফিসের কাজ করতে হবে, আবার কাজে মনোযোগ না বসলেও জোর করে অফিসের কাজ করে যেতে হবে। যা করা উচিত তা করতে থাকতে হবে, আজ বা আগামীকাল এর ফল চোখে না দেখা গেলেও, পরশু এর ফল ঠিকই পাওয়া যাবে।

وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ  উচ্চারণ: ওয়া ‘আমিলুস স্বয়ালিহ্বা-তি… (সূরা ‘আসর ৩)

 

 

 

অর্থ: যারা ভালো কাজ করে

৩.  নতুন কিছু শিখুন: আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদের সূরা ফাতির-এর ২৮ নং আয়াতে বলেছেন- إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ “আল্লাহ তাআলার বান্দাদের মধ্যে  শুধু তারাই তাঁকে ভয় করে যাদের জ্ঞান আছে”। ইসলাম সম্পর্কে আপনি যত জানবেন ততই প্রাত্যহিক ইবাদতগুলো আপনার কাছে ধীরে ধীরে গভীর অর্থবহ হয়ে উঠবে। নামায-রোযাকে আপনার কাছে কেবল রুটিন ওয়ার্ক কোন ব্যাপার বলে মনে হবে না, বরং তখন আপনি এই ইবাদতগুলোর মাঝে ঈমানের সুমিষ্ট স্বাদ আস্বাদন করতে থাকবেন।

পার্থিব জীবনেও সেই ব্যক্তি তত সফল, যে অন্য মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশী অবদান রাখতে পারে।  আর অন্যের উপকারে আসতে চাইলে, আগে নিজের উন্নয়ন করতে হবে। ভালো কথা অন্যকে বলতে হলে আগে নিজেকে ভালো কথা শিখতে হবে।

وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ উচ্চারণ: ওয়াতা ওয়া- সাওবিল হাক্কি… (সূরা ‘আসর ৩)

অর্থ: একে অপরকে সঠিক উপদেশ দেয়

 

 

 

৪. মানুষের উপকারে আসো: নবী হওয়ারও আগে রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর পরোপকারী মানুষ। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন অন্য মানুষদের ভাগ্য উন্নয়নে। আমরাও যত অল্প টাকাই পারি না কেন তা দিয়ে মানুষকে সাহায্য করব, যত অল্প শ্রমই হোক না কেন তা দিয়ে মানুষের উপকার করব, যত অল্পই শিখি না কেন, তা অন্যদের সাথে শেয়ার করব। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীদের সহ সমস্ত মানুষকে উপকারের চেষ্টা করব। কারো কাছ থেকে প্রতিদান চাইবো না, প্রতিদান চাইবো শুধুই আল্লাহর কাছে।

মানুষকে উপকার করার এই পথ মধুর না, বন্ধুর। অনেক সমালোচনা-গালমন্দ শুনব, অনেক অকৃতজ্ঞ মানুষের দেখা পাবো, অনেক সময় আর্থিক বা সামাজিক সংকটে পর্যন্ত পড়ে যেতে পারি – তবু ধৈর্য্য ধরব। যত অল্পই হোক না কেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কন্ট্রিবিউট করব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন – খেজুরের অর্ধেকটা দান করে হলেও নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও (বুখারী)।

وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ উচ্চারণ: ওয়াতা ওয়া- সাওবিস সবর। (সূরা আসর-৩)

অর্থ: একে অপরকে ধৈর্য্যের উপদেশ দেয়।

দ্বিতীয়-তৃতীয় আয়াতে বর্ণিত এই চারটি কাজ যদি আমরা না করি তাহলে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে ডুবে যাবো।  এই ক্ষতির ভয়াবহতা যে কতটা চরম তা বুঝাতে আল্লাহ তাআলা এই কাজগুলোর উপর চারভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

এক. প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা কোন কিছু কসম নেয়ার অর্থ হচ্ছে তার পরের কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ন।

দুই. আল্লাহ তাআলা “ইন্না” দিয়ে বাক্য শুরু করে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। “ইন্না” শব্দের অর্থ হলো “নিশ্চয়ই”।

 

 

 

তিন. আল্লাহ তাআলা “ইন্নাল ইনসানা ফী খুসর” (নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে), না বলে “ফী” এর আগে “লা” যুক্ত করেছেন। এই “লা” এর অর্থ হলো “অবশ্যই”। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যখন বললেন “ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর”, এর অর্থ দাঁড়ায় “নিশ্চয়ই অবশ্যই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে”।

চার. আল্লাহ তাআলা তৃতীয় বাক্য শুরু করলেন “ইল্লা” (“শুধু তারা বাদে” বা Except) দিয়ে। ইল্লা দিয়ে কোন বাক্য শুরু করা হলে সেটা পূর্ববর্তী বাক্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। যেমন – কোন ক্লাসের ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে যদি ৯৫ জন ফেইল করে তাহলে টিচার বলবেন – “এই ক্লাসের ছাত্ররা ফেল করেছে, শুধু কয়েকজন বাদে”, অর্থাৎ ফেল করাটাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা, পাশ করাটা হলো ব্যতিক্রম। একইভাবে, আল্লাহও তাআলা বলতে চাইছেন যে, অধিকাংশ মানুষই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, শুধু গুটিকয় আছে যারা সঠিক পথে আছে।

আমাদের অফিসের কোন বিশ্বস্ত কলিগ যদি এক বা দুইবার নয়, চার চারবার ফোন করে বলে – “বন্ধু, মহাখালীর রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছে, বিরাট জ্যাম, ভুলেও ঐ পথে যেও না, ঘুরে যাও” – তাহলে আমরা বাসায় ফিরতে নিশ্চিত মহাখালীর রাস্তা নিব না। আর, আমাদের পালনকর্তা প্রভু যখন আমাদের একই আয়াতে চারবার সতর্ক করে কোন কিছু করতে আদেশ করেন তখন আমরা কত অনায়াসে সেই আদেশ অমান্য করে দিনাতিপাত করতে থাকি!

ইমাম শাফেঈ’ রহ. বলেছেন – লোকে যদি শুধু এই সূরা (সূরা ‘আসর) নিয়ে চিন্তা করত, সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হত।

 

read more
ইসলাম

বিপদগ্রস্ত? কুরআন আপনাকে যা বলে…

Untitled-3 copy

প্রথমেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি দয়াময় প্রভুর কথা। তিনি আপনাকে বলেছেন- فَإِنَّ مَع‌ الْعُصْرِ يُسْراً إِنَّ مَعَ الْعُصْرِ يُسْرا ‘নিশ্চয়ই কষ্টের পরেই স্বস্তি আছে। অবশ্যই কষ্টের পরে স্বস্তি আছে।’ [সুরা আলামনাশরাহ- ৬]

উক্ত আয়াতটিতে লক্ষ্য করুন- দয়াময় আল্লাহ কত দৃঢ়ভাবে তাকিদ দিয়ে একটিই কথা দুইবার বলেছেন! তাই শান্ত হোন, ধৈর্য্যধারণ করে সময়টাকে শুধু পেরিয়ে যেতে দিন।

আজকের খুব তীব্র কষ্টের অনুভূতিটা আর কয়েক মাস পরে আর এমন তীব্র লাগবে না, দেখবেন দিব্যি এটা মনে করে হাসছেন আর ভাবছেন- ‘আহা সময়টা কেমন করেই না পার করেছি!’ জীবনটা আসলে এমনই।

 

 

 

এসময়গুলোতে যে কাজ আপনার আত্মাকে আনন্দিত করে, সে কাজগুলো করুন। আপনার চেয়েও বিপদ্গ্রস্ত একজন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তার জীবন ও উপলব্ধিকে আপনি অনুভব করুন। দেখুন তার কষ্টের কাছে আপনার কষ্টকে একেবারে নস্যি মনে হবে। যে বিপদগ্রস্ত সময় আপনি পার করছেন, আপনি প্রতিবেশীদের দিকে তাকালে দেখবেন এ বিপদ অন্য অনেকের জীবনে খুবই কমন। তারা দিব্যি খাচ্ছে, ঘুমুচ্ছে, নতুন করে ক্যারিয়ার ও জীবনের পরিকল্পনা করছে। আপনি আযান হয়ে গেলে মসজিদে আগে গিয়ে সামনের কাতারে বসে থাকতে পারেন। আপনি তাকিয়ে দেখুন বয়সের ভারে ন্যুব্জ একেকজন বৃদ্ধ মুসল্লির চেহারায় কি প্রশান্তির আমেজ। তারাও আপনার আমার মত জীবনের বহু ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়েই এ পর্যন্ত এসেছে। সমস্যা জীবনে আসে, সমস্যা কেটেও যায়। কেবল প্রথম ঝাঁকুনিটা একটু তীব্র হয়। পার হয়ে যেতে দিন সময়টা।

আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা আমাদের সব ধরনের সম্ভাব্য অশান্তি, অস্থিরতার উত্তর বলে দিয়েছেন কোরআনে, তিনি আমাদের সমস্ত দু’আ শোনেন। এমনকি বুকের ভেতরে যে চাওয়া, যে আর্তি গুমরে কেঁদে ওঠে নিঃশব্দে, তিনি সেটাও স্পষ্ট শোনেন, জানেন। আল্লাহ সব সময়েই আমাদের সাথে আছেন। জীবনে আমাদের যা কিছু ঘটে, সবকিছুরই অর্থ রয়েছে। কিন্তু, আল্লাহ পৃথিবীটাকে ‘সিস্টেমেটিক’ করে বানিয়েছেন। কষ্ট-প্রশান্তি, শক্তি-দুর্বলতা, সুস্থ-অসুস্থতা সবকিছুই আমাদের জীবনেরই অংশ এবং তারা আল্লাহর নির্দেশেই এগুলো আসে। আল্লাহ খুব ভালো করে জানেন আমাদের অবস্থা। তাই কখনোই আশা না হারিয়ে বরং ধৈর্যধারণ করা উচিত। নিশ্চয়ই কষ্টের পরেই স্বস্তি থাকে।

 

 

 

 

মুমিন বান্দার জীবনে যতক্ষণ ঈমান আছে বুকের ভেতর, তার সবকিছুই কল্যাণকর। এমনকি শরীরে কাঁটা ফুটলেও, রোগ হলেও, সম্পদ হারিয়ে গেলেও, পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া প্রিয়জনের শোকের মাঝেও কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ এসবের বিনিময়ে পুরস্কার দেবেন এবং তার পরিমাণও হবে অনেক বড় যা আমাদের কল্পনার অতীত।

ভেবে দেখুন, আমাদের জীবনটা কিন্তু অনেকটা বহুতল ভবনের মত। প্রতিটি দিনে আপনি গেঁথে চলেছেন একেকটি তলা। আপনার আজকের দিনটির উত্তম বিনির্মাণ আপনার আগামী দিনের মজবুত গাঁথুনির আত্মবিশ্বাস দেবে। আপনার বর্তমান হলো আপনার জন্য উপহার। এই মুহূর্ত, এই দিনটি তেমন করে গড়ে তুলুন যেমনটি আপনি চান। জীবনটা খুব অমূল্য উপহার। কষ্ট -যন্ত্রণা? সেটা নেই কার জীবনে বলুন? নবী-রাসূলরা আল্লাহর প্রিয়তম ছিলেন, তারা আরো বেশি কষ্ট পেয়েছেন। এই কষ্টগুলোর মাঝে আছে মুক্তির পয়গাম, অনন্ত শান্তির প্রচ্ছন্ন বার্তা।

জীবনে যা-ই আসুক, আলিঙ্গন করে গ্রহণ করে নিন। প্রতিটি মুহূর্ত খুব সুন্দর, স্বপ্নময়। এই বর্তমানে মন দিন, উজাড় করে দিন আপনার সবটুকু। ভেঙে ফেলুন আপনার মাঝে জমে থাকা শঙ্কা ও উদ্বিগ্নতার দেয়াল। আপনি যা চান, তা করতে থাকুন আপ্রাণ প্রচেষ্টা দিয়ে, লক্ষ্যে আপনি অবশ্যই পৌঁছবেন। আপনি বিশ্বাসী হলে এই দুঃসময়ে আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার সাথে আছেন! কঠিন সময়ে আপনার আর্ত-আহবান শোনার কথা কত উত্তমভাবে তিনি বলে দিয়েছেন কুরআনে! তিনি বলেন-

 

 

 

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبِادِيْ عَنِّيْ فَإِنِّيْ قَرِيْبٌ. أُجِيْبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ. فَلْيَسْتَجِيْبُوْ لِيْ وَلْيُؤْمِنُوْا بِيْ لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُوْنَ.

‘আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যপারে, আমি তো রয়েছি সন্নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার আহবানে সাড়া দেই। অতএব, তারাও যেন আমার ইবাদতে প্রবৃত্ত হয় এবং আমার উপর নিঃসংশয়ে আস্থা স্থাপন করে- যাতে তারা সরল পথের দিশা লাভ করতে পারে।’ [সুরা বাকারা:১৮৬]

তো, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী যখন আপনার পাশে আছেন, আর কেন চিন্তায় ডুবে থাকা? পূর্ণ নিঃসংশয় বিশ্বাস আর আস্থা রেখে এগিয়ে যান। তার কাছে চেয়ে নিন যা চেয়ে নেওয়ার- সাহস সাহায্য। আপনিও তাঁর ইবাদতে প্রবৃত্ত হয়ে কৃতজ্ঞ হোন।

 

read more